ভারতে ধর্ষক ধর্মগুরুর বিরুদ্ধে রায়; বিক্ষোভে নিহত ২৯

রাম রহিমের বিরুদ্ধে রায় ঘোষনার সময় বাইরের অবস্থা

ধর্ষণের মামলায় ভারতের ‘ধর্মগুরু’ রাম রহিম সিং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় ঘোষণার পর তাঁর সমর্থকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষে কমপক্ষে ২৯ জন নিহত হয়েছেন।  শুক্রবার ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পঞ্চকূলা শহরে এ ঘটনা ঘটে।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই শহরে অবস্থিত সিবিআই (সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) আদালত শুক্রবারই গুরমিত রাম রহিম সিংকে ধর্ষণের মামলায় দোষী ঘোষণা করেছেন। আগামী সোমবার তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে।

হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে  বলা হয়েছে, রাম রহিমের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পর পঞ্চকূলা শহরে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হন। তবে নিহত ব্যক্তিদের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। পঞ্চকূলা বেসামরিক হাসপাতালের একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের দেহে গুলির আঘাত রয়েছে।

দুই অনুসারীকে ধর্ষণের অভিযোগে ভারতের আলোচিত ‘ধর্মগুরু’ গুরমিত রাম রহিম সিং দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে রাম রহিমের সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।

এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, রায় ঘোষণার পর অপরাধে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন রাম রহিম। দেশটির হরিয়ানা রাজ্যের পুলিশ এরই মধ্যে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। একটি হেলিকপ্টারে করে আদালত থেকে তাঁকে রোহতাক কারাগারে নেওয়ার কথা রয়েছে।

রাম রহিমকে দোষি সাব্যস্ত করার পর সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে আশ-পাশের এলাকায়

আদালত দুপুরে রায় ঘোষণার পরপরই ৫০ বছর বয়সী রাম রহিমকে কড়া পাহারার মধ্যে আম্বালা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। রায় শোনার পর আদালতের বাইরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বহু সমর্থক। টেলিভিশন ফুটেজে ওই সময়ই রাম রহিমের অনুসারীদেরকে সহিংসতায় লিপ্ত হতে দেখা গেছে।

২০০২ সালে রাম রহিমের এক সাবেক নারী অনুসারী এ মামলা করেছিলেন। ওই নারীর অভিযোগ, হরিয়ানার শহর সিরসায় দেরা সাচা সৌদা গোষ্ঠীর প্রধান কার্যালয়ে রাম রহিম তাঁর ওপর যৌন নির্যাতন করেন।

কিন্তু পনেরো বছর আগে নিজের আশ্রমেই দুজন ভক্ত মহিলাকে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালে শুনানি শুরুর পর দশ বছরের মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে। বিচারের পুরোটা সময় নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এসেছেন ডেরা সাচ্চা সওদার প্রধান।

বর্তমানে পঞ্চকূলা শহরে সান্ধ্য আইন জারি আছে। শুক্রবারের রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণ, সংশ্লিষ্ট এলাকা ও পুরো পঞ্চকূলা শহরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা রাজ্যজুড়ে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়।

রায় ঘোষণার পরপরই রাম রহিমের হাজার হাজার অনুসারী বিক্ষোভ করতে গিয়ে সহিংস হয়ে ওঠেন। তাঁরা বিভিন্ন যানবাহন ও সরকারি অফিসে ভাঙচুর চালান। এ ছাড়া পঞ্চকূলা শহরের কিছু আবাসিক কলোনিতেও ভাঙচুর চালানো হয়। শহরের একটি পেট্রলপাম্প ও পাঁচতারকা হোটেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

রাায় ঘোষনার পর গাড়ি ও রেল স্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেয় রাম রহিম ভক্তরা

শহরটির তিন নম্বর সেক্টর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ওই এলাকাতেই সিবিআইয়ের আদালতটি অবস্থিত। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুরু কালো ধোঁয়া দেখা গেছে।

ভারতের বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেলের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, রাম রহিমের শতাধিক অনুসারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। একপর্যায়ে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং বিক্ষোভকারীদের লাঠিপেটা করে। সংঘর্ষে কমপক্ষে একজন সাংবাদিক আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

শুধু পঞ্চকূলা নয়, পাঞ্জাবেও ছড়িয়ে পড়েছে সহিংসতা। ওই রাজ্যের মালৌত শহরে একটি রেলস্টেশনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই রাজ্যের মানসা শহরে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং দুটি যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রায় শোনার জন্য গত কয়েক দিন ধরেই রাম রহিমের অসংখ্য অনুসারী পঞ্চকূলায় জমায়েত হতে থাকেন। গতকাল মধ্যরাতে এই ‘ধর্মগুরু’ এক ভিডিও বার্তায় তাঁর অনুসারীদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি অনুসারীদের প্রতি শান্ত থাকারও আহ্বান জানিয়েছিলেন।

ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধে দোষী ‘ধর্মগুরুদের’ তালিকায় সাম্প্রতিকতম সংযোজন এই রাম রহিম সিং। আসারাম নামের আরেক ধর্মগুরু ও তাঁর ছেলে বর্তমানে ধর্ষণের অভিযোগে কারাগারে আছেন।

বিবিসি খবরে বলা হচ্ছে, একাধারে ধর্মপ্রচারক, সমাজ সংস্কারক, গায়ক, চিত্রনায়ক ও পরিচালক বাবা রাম রহিমের মতো বর্ণময় চরিত্র ভারতের অজস্র ধর্মগুরুর মধ্যেও বিরল। শিখ, হিন্দু, মুসলিম- সব ধর্মের চেতনা মিশিয়ে বাবা রাম রহিম তৈরি করেছেন তার আশ্রম- ডেরা সাচ্চা সওদা।

হরিয়ানায় গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রতি সমর্থন দিয়েছিলেন রাম রহিম। লাখ লাখ ভক্ত থাকায় বড় ভোট ব্যাংক বিবেচনা করে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির অনেক নেতাই তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখেন।

 

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


20 − seven =